বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪
অপারেশন সার্চলাইট ও স্বাধীনতা ঘোষণা
আলমগীর খোরশেদ
প্রকাশ: শনিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৪, ৩:২৬ PM
নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে সেনাপতি মীরজাফরের বেঈমানিতে পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়ে যায়। প্রায় দুইশত বছর ইংরেজ শাসনের লাগাম, নিপীড়ন, নির্যাতন সহ্য করেছে ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণ। নিজ দেশকে ঔপনিবেশিক নাগপাশ থেকে মুক্ত করতে হয়েছে স্বদেশি, সিপাহী বিপ্লব, ফকির ও সন্যাস বিপ্লব, প্রাণ দিয়েছেন মহিশুরের টিপু সুলতান, তীতুমীর, ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্যসেন, বীরকন্যা প্রীতিলতার মতো অসংখ্য নাম না জানা বিপ্লবী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নেতাজী সুভাস চন্দ্র বসুর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। অনেক পানি ঘোলা করে শেষমেষ ইংরেজরা এ দেশ ছাড়ে। যাবার আগে হিন্দু মুসলিম জাতিগত দ্বন্দ্বের পোকাটা নেতাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ যে আশা ও স্বপ্ন নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান তথা পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান নামে ভাগ হয়েছিল, তা বাস্তবে ব্যর্থ হয়। দ্বিজাতি তত্ত্ব মানে হিন্দু-মুসলিম জাতিভেদ দীর্ঘদিন হিন্দু-মুসলিম ভাই বন্ধু হিসেবে সহাবস্থানে বিভক্তির বীজ পুঁতিত হয়। রায়ট হয়, দাঙ্গা হয়। স্বাধীনতার বীজ বপিত হয়ে মানুষ সোচ্চার হতে থাকে অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে।

পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠীর পূর্ব পাকিস্তান তথা পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন, দাবিয়ে রাখা, হেয় করা, অর্থনৈতিক বৈষম্য করে মাটির সাথে মিশিয়ে রাখার মতো পর্যায়ে চলে যায়। পশ্চিমা শাসকরা প্রথম আঘাতটা আনে ভাষার ওপর, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পাঁয়তারার মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বলিষ্ট নেতৃত্বে বাঙালি জাতিকে একত্রিত করে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন বোনায় এগিয়ে আসেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বাংলার ছেলেরা প্রতিবাদ করে, মিছিলে গুলি চলে, বাঙালিরাই বিশ্বে একমাত্র জাতি, যারা  মাতৃভাষা রক্ষার  জন্য জীবন দিয়েছিল। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালের স্বাধিকার, ১৯৬৬ সালের ছয়দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দল আওয়ামী লীগ নিরংকুশ জয় পায়।  তৎকালীন পূর্ব বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষ ছিলো শেখ মুজিবের নেতৃত্বে স্বাধীনতার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ। একজন নেতার প্রতি এমন আনুগত্য, শেখ মুজিবের অসহযোগ আন্দোলনে সবার সাড়া দেওয়া ছিলো অবিস্মরণীয় এক ঘটনা। যা এর পূর্বে আর কোনো নেতা পারেননি। আওয়ামী লীগের একচেটিয়া জয়লাভের পর নিয়মানুযায়ী বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা। ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ভবনে জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলি ভুট্টো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করেন। যা ছিল ছয় নম্বর বৈঠক। ২৩ মার্চ সারা দেশে প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উড়ানো হয় সারা দেশে। ওই সময়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করছিলেন জুলফিকার আলি ভুট্টো।  ওখানেও ওড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা। শেখ মুজিবুর রহমান তার বাসভবন বত্রিশ নাম্বারে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। 

‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি সমবেত কণ্ঠে বাজানো হয় সারা বাংলায়। রাজপথে লাঠি, বন্দুক, বর্শার মাথায় স্বাধীন বাংলার পতাকা বেঁধে ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে মুখরিত হয় রাজধানী ঢাকা। পাকিস্তান শাসকদের লোক দেখানো দফায় দফায় বৈঠক চলে কিন্তু গোপনে সেনা এনে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর আঠারো মিনিটের, এগারো শত শব্দের ভাষণে আকার ইঙ্গিতে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করার কথা উল্লেখ করেছেন। ১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এলে বাবুর্চিরা তাকে রান্না করে খাওয়াতে অপারগতা প্রকাশ করে। অগত্যা কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করে। বাবুর্চিদের বলে দেওয়া হয়, তারপর তারা প্রেসিডেন্টকে রান্না করে খাওয়াতে সম্মত হয়। ওই সময় দেশের সাতটি সেনানিবাস শুধু পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী চালায়, আর গোটা দেশ চলে বঙ্গবন্ধুর কথায়। সব সংগঠন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। 

২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন  সার্চলাইট’ নামে বাঙালি নিধনে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। যা ছিল নভেম্বরে পরিচালিত ‘অপারেশন ব্লিটজ’-এরই পরবর্তী ভার্সন। অপারেশন ব্লিটজের উদ্দেশ্য ছিল যদি শেখ মুজিবের সাথে পূর্বপাকিস্তানের রাজনৈতিক কোনো সুরাহা না হয়, তাহলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা অর্থাৎ পুনরায় সামরিক শাসন জারিকরণ। এরই মধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার সফরসঙ্গী জেনারেল আবদুল হামিদ খান, লে. জেনারেল এসজিএমএম পীরজাদাসহ অন্যান্য সামরিক পদস্থ কর্মকর্তাদের নিয়ে ঢাকায় আসেন, যার সংবাদটি গোপন রাখা হয়। ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী, শিক্ষক, শ্রমিক, সর্বস্তরের মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে। এটিই ছিলো অপারেশন সার্চলাইট, ওই রাতকে বলা হয় ‘কালরাত’। অপারেশন সার্চলাইটের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন জেনারেল টিক্কা খান। ২৫ মার্চ রাতে জিরো আওয়ারে অপারেশন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তীতে সামরিক কৌশল অবলম্বন করে সময়টা এগিয়ে আনা হয়। অপারেশন সার্চলাইটের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন লে. জেনারেল টিক্কা খান, ঢাকার নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল রাও ফরমান আলী, ঢাকার বাইরের অংশের দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল খাদিম। অপারেশন সার্চলাইট নামে ২৫ মার্চ কালরাতে শুরু হয় গণহত্যা। যার বিশ্ব স্বীকৃতি আজ সময়ের দাবি। ২৫ মার্চ টিক্কা খান, জেনারেল রাও ফরমান আলী, জেনারেল নিয়াজি এদের মাস্টার প্লানে বাঙালি নিধনের মহোৎসবে মেতে উঠে। ওই দিন তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে গোপনে দেশ ত্যাগ করেন। বলে দিয়ে যান, ‘কিল দি পিপল থ্রি মিলিয়ন।’

২৫ মার্চ রাতের মধ্যপ্রহরে মানে ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হন। গ্রেফতারের পূর্বেই তিনি এক তারবার্তায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, ‘ইহাই হয়তো আমাদের শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছে, যাহার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চুড়ান্ত বিজয় অর্জন না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।’ পরদিন ২৬ মার্চ সকালে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা এম এ হান্নান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ওই ঘোষণা পাঠ  করেন। পরদিন ২৭ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।

আর এভাবেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাওয়ালপিন্ডির মিয়ান ওয়ালি কারাগারে বন্দী রাখা হয়। নয়মাস যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্ত, পৌনে তিন লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে জাতি ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ জয়ী হয়ে পায় একটি দেশ, স্বাধীনতা, বিশ্ব মানচিত্রে শোভা পায় বাংলাদেশ আর বাতাসে পত পত করে উড়ে লাল সবুজের পতাকা।

আজকালের খবর/আরইউ








সর্বশেষ সংবাদ
আট হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার সনদ বাতিল : মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী
তেজগাঁওয়ে সারানো হলো লাইনচ্যুত বগি, ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক
‘ভারত বর্জন’ প্রচারণায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হবে না: শ্রিংলা
ওমানে বন্যায় ১৮ জনের মৃত্যু, বৃষ্টিতে ডুবে গেছে দুবাই বিমানবন্দর
বার্সাকে কাঁদিয়ে সেমিফাইনালে পিএসজি
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
নিসচার ১০ম মহাসমাবেশ উদযাপন কমিটি গঠন
মালয়েশিয়ায় তালাবদ্ধ ঘরে মিললো ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী জয়ের মরদেহ
ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ
উপজেলা নির্বাচন : বিশ্বনাথে ৩ পদে ২০ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা
অস্ত্রসহ কেএনএফের আরো ৮ সদস্য আটক
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft